ঈমান সবসময় মজবুত রাখা উচিত।



ঈমানের অগ্নিপরীক্ষার চিত্র ফুটে ওঠে হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত (রাযিআল্লাহু আনহু)-এর জীবনী থেকে। আল্লাহর রাস্তায় যে সকল মহাপ্রান সহাবী নিজ জীবন বিলিয়ে দিয়ে ধন্য হয়েছিলেন, যারা কাফিরদের নির্যাতনের পরীক্ষায় নিজেদেরকে অকাতরে নিক্ষেপ করেছেন, হযরত খাব্বাব (রাঃ) তাদের অন্যতম । 

-

একদম প্রাথমিক পর্যায়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন, হযরত খাব্বাব (রাযিআল্লাহু আনহু) তাদের একজন। সম্ভবত ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে পাঁচ ছয় জনের পরই তার স্থান হবে। কাজেই সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাঁকে কাফিরদের নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছিল।

খাব্বাব (রাযিআল্লাহু আনহু) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি ছিলেন উম্মে আনসার নামক এক মহিলার ক্রীতদাস। তিনি কয়লার মধ্যে লোহা গলিয়ে ঢাল, তলোয়ার ও বর্শা তৈরির কাজ করতেন। হযরত খাব্বাব (রাযিআল্লাহু আনহু)-এর মনিব মহিলাটি ছিল নিষ্ঠুরতার জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি। তাঁর মনিব যখন জানতে পারে, সে মুহাম্মদ (সঃ) এর কাছে আসা যাওয়া করে, তখন সে লোহা গরম করে তাঁর মাথায় দাগ দিত। পরবর্তীতে যখন সে জানতে পারল খাব্বাব ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তখন তাঁর উপর আরও নির্মম অত্যাচার শুরু হলো। তাঁকে লৌহবর্ম পরিধান করিয়ে রোদে শুইয়ে রাখা হত : ফলে তাঁর শরীর হতে ঘাম বইতে থাকত। অধিকাংশ সময় তাঁকে খালি দেহে উত্তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে রাখা হত, ফলে তাঁর কোমরের মাংস গলে পড়ে গিয়েছিল।

-

অত্যাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, মনিব উম্মে আনসার এবং তার ভাইয়েরা হযরত খাব্বাব (রাযিআল্লাহু আনহু)কে জ্বলন্ত কয়লার ওপর শুইয়ে রেখে পাথর চাপা দিতো। আর তার শরীরের রক্ত মাংসগুলো গলে পড়ে একসময় কয়লার আগুন নিভে যেত। কয়লার আগুনে ঝলসে গিয়ে তার শরীরে এমন ধরনের গর্ত হয়েছিল যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই গর্তগুলো পূরণ হয়নি। সেইজন্য তিনি সব সময় গায়ের ওপর চাদর জড়িয়ে রাখতেন। চাদরের ব্যাপারে তার বক্তব্য ছিল- ‘একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমার পিঠ ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে, তাই পরকালে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে সেই পিঠ দেখানো ছাড়া দুনিয়ার কোনো মানুষকে দেখাবো না।’ এত নির্মমতার মধ্যেও তিনি ঈমান থেকে দূরে সরে যাননি।

-

হযরত উমার (রাযিআল্লাহু আনহু) এর খিলাফতকালে একদিন হযরত উমার (রাযিআল্লাহু আনহু) খাব্বাব (রাযিআল্লাহু আনহু)কে তাঁর উপর নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ জানতে চাইলেন। খাব্বাব (রাযিআল্লাহু আনহু) তখন বললেন, “আমার কোমর দেখুন।’’

হযরত উমার (রাযিআল্লাহু আনহু) কোমর দেখে আঁৎকে উঠে বললেন, ‘‘”হায় একি অবস্থা! এমন কোমর তো কথোও দেখিনি? কিভাবে হলো এমনটি?’’

তখন খাব্বাব (রাঃ) বলেন, “আমাকে জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর শুইয়ে ধরে রাখা হত, ফলে আমার চর্বি এবং রক্ত প্রবাহিত হয়ে আগুন নিভে যেত ।”

-

এমন নির্মম নির্যাতন ভোগ করা সত্ত্বেও ইসলামের যখন শক্তি বৃদ্ধি হলো এবং মুসলমানদের বিজয় সূচিত হলো, তখন খাব্বাব (রাযিআল্লাহু আনহু) রোদন করে বলতেন, “আল্লাহ না করুন! আমার কষ্টের প্রতিদান দুনিয়াতেই যেন লাভ না হয় ।”

হযরত খাব্বাব (রা) বলেন, “একদিন আমি দেখলাম, নবী করীম (সা) কা’বা ঘরের দেয়ালের ছায়ায় বসে আছেন। আমি উপস্থিত হয়ে আরয করলাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি আমাদের জন্য দোয়া করবেন না?’ এই কথা শুনামাত্র নবী করীম (সা) এর মুখমন্ডল আবেগে রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। তিনি বললেন, তোমাদের পূর্বেকার ঈমানদারদের উপর তো এর চেয়েও অধিক কঠোর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তন্মধ্যে কোন কোন ঈমানদারকে ধরে এনে যমীনের গর্তে কোমর পরিমাণ গেড়ে দিয়ে তার মাথার উপর করাত চালিয়ে তাকে দ্বিখন্ডিত করা হতো। কারও গায়ের গোশত লোহার চিরুনী দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হতো। এইসব কিছুর মূল উদ্দেশ্য ছিল লোকদিগকে ঈমান থেকে ফিরিয়ে রাখা। আল্লাহর কসম ঈমানদারদের এই ত্যাগ ও সাধনা পূর্ণ হবেই। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন হবে যে, এই ব্যক্তি সানয়া হতে হাদরামাওত পর্যন্ত নির্বিঘ্নে সফর করবে এবং এ সময় আল্লাহ ছাড়া আর কারও ভয় তাকে করতে হবে না। (সহিহ বুখারী )

মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হযরত খাব্বাব (রাঃ) এর মৃত্যু হয় এবং সহাবাদের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনিই কুফায় কবরস্থ হন। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত আলী (রাঃ) তাঁর কবরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলেন, “আল্লাহ খাব্বাবের উপর রহমত করুন। তিনি নিজের ইচ্ছায় মুসলিম হয়েছিলেন, নিজ খুশিতেই হিযরত করেছিলেন । সমস্ত জিহাদে অংশ গ্রহণ করে অশেষ নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। এ ব্যক্তির প্রতি মোবারকবাদ, যে আখিরাতকে স্মরন করেন এবং শেষ হিসেবের জন্য তৈরী হন; যিনি জীবন যাপনের উপযোগী সামান্যতম সম্পদ নিয়ে সন্তুষ্ট থেকে নিজের রব্বকে রাজী রাখার চেষ্টা করেন ।” 

(উসদুল গাবা)।

Add a post Now

Comments

Please login to comment

Login Now

// FEATURED

  • স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে পর্দা নিয়ে কথোপকথন

    09 May 2019

  • স্বামী -: তুমি কি বোরকা ছাড়া আগামী শুক্রবার তোমার চাচাতো বোনের বিবাহের অনুষ্ঠানে যেতে চাচ্ছো?? স্ত্রী :- হ্যাঁ!! কেনো নয়?? বিশেষ একটা দিন! স্বামী -: নাহ, তুমি বোরকা ছাড়া ঘর থেকে বেরহতে পারো...


  • নামাজ পড়ার ফজিলত ও নামাজ ত্যাগের ভয়াবহ পরিনতি

    09 May 2019

  • ১। হযরত হানযালা আল উসাইদী রাযি. হতে বর্ণিত, عن حنظلة الاسيدى ان رسول الله صلى الله عليه و سلم قال من حافظ على الصلوات الخمس على وضوئها ومواقيتها وركوعها وسجودها يراها حقا لله عليه حرم على النار রাসূ...


  • নামাজ সম্পর্কিত কিছু আয়াত ও হাদীস

    09 May 2019

  • আয়াত নং-১: اِنَّ الصَّلٰوةَ تَنْهٰى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ- অর্থাৎ- নিশ্চয়ই নামায মানুষকে অশ্লীল ও ঘৃণিত কাজ থেকে বিরত রাখে। সূরা: আনকাবূত, আয়াত-৪৫ আয়াত নং-২ حٰفِظُوْا عَلَى الصَّلٰوتِ وَ...


  • উন্নত বিশ্ব এবং আমাদের মধ্যে পার্থক্য কি?
    উন্নত বিশ্ব এবং আমাদের মধ্যে পার্থক্য কি?

    03 May 2019

  • আমার স্টুডেন্ট আমাকে একবার প্রশ্ন করলো , আচ্ছা ভাইয়া , যে আমেরিকা পরমানু বোমা বানাতে পারে , রকেট বানাতে পারে , আধুনিক যুদ্ধ বিমান বানাতে পারে , তারা কি নিজেদের পোশাক , জামা কাপড় নিজেরা বানাতে পারে না...


  • দাম্পত্য জীবনে সুখী হবার উপায়
    দাম্পত্য জীবনে সুখী হবার উপায়

    06 November 2018

  • #দাম্পত্য_জীবনে_সুখি_হওয়ার_উপায়   #স্বামীদের_জন্য   "আরে বলিস না দোস্ত বউয়ের জ্বালায় বাসায় যেতে ইচ্ছে করে না!!সবসময় একই কথা,তুমি আমাকে আগের মতো ভালবাস না,সময় দাও না!!প্রতিনিয়ত এসব শুনতে...